কাউকে এতটা ভয় দেখাবেন না, যাতে তার মন থেকে সমস্ত ভয়ই শেষ হয়ে যায়।
(শিরোনামের বাক্য, ধ্রুব রাঠির পোস্ট থেকে নেওয়া।)
কৃষ্ণনগরের সেই বিখ্যাত মাটির পুতুল – টিকটিকির মুখে আরসোলা।
দেখলে মনে হবে, একেবারে জ্যান্ত। অবিকল বাড়ির দেওয়ালের টিকটিকি। তার মুখে শিকার। আরসোলা।
মনে পড়ে?
এখন হয়তো কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির সেই অসামান্য মাটির পুতুলের পাড়ায়, আরসোলা ও টিকটিকি বেঁচে আছে কী না বলা মুশকিল।
নিশ্চয়ই আছে ধরে নিচ্ছি।
ছোট থেকে ওই টিকটিকিকে শুধুই টিকটিকি ও আরশোলাকে, নেহাতই আরশোলা বলেই আমরা ভেবে এসেছি এতদিন।
কিন্তু সুরিয়াকান্ত জানিয়ে দিয়েছেন, আরসোলা আসলে কী। কোন চার অক্ষরকে বলে ককরোচ!! আরসোলা বা ককরোচ – দুইএরই বানান চার অক্ষরের। (অন্য কিছু না ভাবাই ভাল। সময় ভাল নয়)
আর বিভিন্ন গোয়েন্দা গল্পে টিকটিকি মানে এতদিন আমরা জেনে এসেছি পুলিশের ফড়ে। অথবা গোয়েন্দা স্বয়ং।
কিন্তু ধারনা বদলের সময় কী এসে গেছে এখন?
পরের দু তিন অনুচ্ছেদ পড়ে ভাবতে হবে সেটা।
যন্তর মন্তরে যুবকটি চিৎকার করে বলছে, মারো, আরও মারো আমাকে।‘
প্রথমে কয়েকবার পুরুষ্টু লাঠি চালিয়ে পুলিশও তখন হতভম্ব। যুবকটিকে কষিয়ে লাঠি পেটা করা যেত, যদি সে পালানোর চেষ্টা করতো।
কিন্তু প্রথম লাঠির ঘা খেয়ে সে ছিটকে পিছলো দু তিন পা। তার চার পাশে ঊর্দি পরা ফোর্স। যুবকটি একেবারে কেন্দ্রে। সে ওই শক্ত লাঠির ঘা খেয়েও কঁকিয়ে ওঠে নি। উলটে বলছে, মারো, আরও মারো।
তথাকথিত ডিসিপ্লিন্ড ফোর্সও কয়েক সেকেন্ড থতমত তখন।
এক মহিলা সুরক্ষা কর্মী এগিয়ে এসে যুবকটিকে ঠেলে সরিয়ে দিলেন। ওই সামান্য অবসরে এক পুলিশ কর্মী থাকতে না মেরে থাপ্পরও মেরে দিলেন যুবকের গালে।
দৃশ্য এই টুকুই।
কয়েক সেকেন্ডের ওই দৃশ্য দেখে যদি কারো রাগ না হয়, অবিলম্বে তার গয়া গিয়ে নিজের আগাম শ্রাদ্ধ সেরে ফেলা উচিত।
এক্স হ্যান্ডেলে এক ইউজার এটা নিয়ে যা তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন, তা পরে বলছি।
কিন্তু এই ভয়ানক দৃশ্য আপনি আমি দেখলাম কোথায়? কোন সংবাদ মাধ্যমে?
ভারতের কোনও মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ দৃশ্য দেখায় নি। সকাল থেকে অজিত অঞ্জুমের মতো স্বাধীন রিপোর্টার বা ইউটিবার দেখিয়ে দিয়েছেন, হাজারে হাজারে মানুষের ভিড়ে বেমালুম গায়েব ভারতের মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম। অঞ্জুমের মতো আরও অনেক ফ্রিলান্সার সাংবাদিক সারাক্ষন কভার করছিলেন যন্তর মন্তর।
এবং ছিলেন বিদেশের সাংবাদিক। আল জাজিরা, ব্লুম্বার্গ, গার্ডিয়ান, রয়টার্স, অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যশনাল, অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যম যন্তর মন্তর কভার করেছে। করারই কথা। তাদের প্রতিনিধি বা সোর্স অবশ্যই ছিল।
কিন্তু টিকটিকিরা কোথায়?
এখন গোয়েন্দা বা পুলিশের ফড়েকে কী আর টিকটিকি বলা যাবে?
নাকি টিকটিকির নতুন সংজ্ঞা এসে গেছে সামনে?
কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির ওই আরসোলা শিকার করা টিকটিকি কী এখন আসলে ভারতের মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম?
আরসোলা শিকার করতে ভালবাসে তারা?
আমরা যাদের চিল চিৎকার করে তথাকথিত খবর পড়তে বা আলোচনা সভা পরিচালনা করতে দেখি, তারাই শুধু টিকটিকি ভাবলে ভুল হবে। এক সংবাদ মাধ্যমে রুটি রুজি বহু মানুষের। টিকটিকি তো আসলে তারাও। ভেড়ার পালের মতো তারা সেই অফিসেই যায়, যে অফিস চোখ বুঁজে থাকে যন্তর মন্তর থেকে।
আপনার আমার আশপাশে ওই পালের কেউ কেউ থাকলে সাবধান হওয়ার সময় হয়েছে কী এবার?
খুউব সাবধান!!!
এই ভেড়ার পাল বলতেই গোপাল ভাঁড়ের সেই কাহিনি মনে পড়ল। মোসাহেব পদের জন্য ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন গোপাল। অনেকেই সে গল্প জানেন।
এখানে আর এক বার সেটা বলে ফেলা যাক।
ছেলেটিকে দেখে গোপাল বললেন, অ। তুমি এসেছো? তুমি কী পারবে?
ছেলেটি মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ঠিকই বলেছেন আপনি। আমি বোধহয় পারব না। সময় নষ্ট করতে এসেছি।
গোপাল হেসে বললেন, তা কেন? এমন কী কঠিন কাজ। ও তুমি ঠিক পারবে।
ছেলেটি বলে উঠল, সেইই তো। এমন কী কঠিন কাজ। ও আমি ঠিক পারব।
গোপাল মাথা নাড়িয়ে বললেন, বটে? অত সোজা?
ছেলেটি ফের মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, কঠিন কাজ, না? পারব না মনে হচ্ছে।
গোপাল আবার বললেন, ধুর, কী যে বলো। এত দূর এসেছো, হাওয়া খেতে তো আসো নি।
ছেলেটি বলল, তা যা বলেছেন। হাওয়া খেতে তো আসিনি। কাজ করতেই এসেছি।
গোপাল বললেন, মোসাহেবি অত সহজ নয়।
ছেলেটি বলল, একেবারেই সহজ নয়।
গোপাল বলল, তবে খুব কঠিনও নয়।
ছেলেটি বলল, যথার্থ বলেছেন। খুব কঠিনও নয়।
গোপাল বললেন, ভাবছি। তুমি পারবে কী না।
ছেলেটি বলল, আমিও ভাবছি। পারব তো?
এর পরের লাইন অবশ্য ওই কাহিনিতে নেই। গোপাল বলেছিলেন, কাজ শুরু করো। তবে যন্তর মন্তরে যেও না। আর রাহুল গান্ধী বলে যে লোকটা আছে, ও কিন্তু পেটে বিদ্যে থাকলেও আমরা বলব, পাপ্পু।
গোপাল ভাঁড়ের কাছে পাশ করা সেই মোসাহেব স্বাভাবিক ভাবেই দূরে ছিল যন্তর মন্তর থেকে। রাহুলের দেরাদূন র্যালি বা ভারত জোড়ো যাত্রা থেকেও বহু দূরে ভাঁড় মিডিয়ার টিকটিকি সাংবাদিক।
কিন্তু যন্তর মন্তরে ওই যুবক বলছে, মারো , আরো মারো। এই ফুটেজ শেয়ার করে এক ইউজার কী লিখেছেন এক্স হ্যান্ডেলে পড়ুন। -
এই হলো আমাদের ব্যবস্থা এবং ভারতের জাগ্রত যুবসমাজ, যারা কারো কাছে মাথা নত করবে না। যারা এই ভিডিওটি রিটুইট করবে না, তাদের সাথে বন্ধুত্ব শেষ! ভারতের প্রত্যেকের এটি দেখা উচিত। তিনি যদি কোনো ভুল করেও থাকেন, তবে কোন নিয়ম ও আইনের অধীনে আপনি লাঠিচার্জ ও গ্রেফতারের পথ বেছে নিচ্ছেন—তা-ও আবার যখন তিনি কেবল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন?" এক্স হ্যান্ডেলে এই ইউজারের নাম Gurpreet Garry Walia
আল জাজিরার পোস্ট এক্স হ্যান্ডেলে লেখা হয়েছে, "ভারতের রাজধানীতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জমায়েত হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা বাতিলের পর পর কয়েকটি কেলেঙ্কারির ঘটনার প্রেক্ষিতেই এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।"
এক্স-এ মহম্মদ জুবের লিখেছেন, "অধিকাংশ গোদি মিডিয়ার অ্যাঙ্কররা তাদের স্টুডিওতে আরামে বসে সরকারি প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফিল্ডের গোদি রিপোর্টাররা মূলত পুলিশের পেছনে দাঁড়িয়ে এই বিক্ষোভের কভারেজ দিচ্ছেন এবং সরকারঘেঁষা ন্যারেটিভ তুলে ধরছেন।
অন্যদিকে, বিদেশি প্রতিনিধি এবং একাধিক স্বাধীন সাংবাদিক ও ইউটিউবাররা ফিল্ডে গিয়ে আন্দোলনকারীদের কথা ও তাদের মূল দাবিগুলো নিয়ে রিপোর্ট করছেন।"
ব্লুম্বার্গ, রয়টার্স সমেত বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম হাজির। কিন্তু কোথাও ছিল না ভারতের মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম।
না না ছিল।
এন ডি টি ভি সম্ভবত ওই জমায়েত কতটা বিশৃংখল তা দেখানোর জন্য মোসাহেব সাংবাদিককে পাঠিয়েছিল যন্তর মন্তরে।